শোকাবহ ১৫ আগস্ট: বিষাদময় রক্তাক্ত কালো দিন

আজিজ পাশা: বছর ঘুরে ক্যালেন্ডারের পাতায় আবারো শোকের দিন- ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে সপরিবারে প্রাণ হারান বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা তাদের স্মরণ করি। মর্মস্পর্শী এ হত্যাকাণ্ডের আজ ৪৩ বছর পূর্ণ হলো। ১৫ আগস্ট কেবল একজন রাষ্ট্র নায়ককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়নি। বরং এর পেছনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকেও ধূলিসাৎ করা হয়েছে। ইতিহাসের ঘৃণ্য এ হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় কার্যকরের পর জাতি শোক দিবস পালন করছে একরকম স্বস্তির ভেতর দিয়ে। বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কেঁদে ফেরার অবসান হয়েছে ঘাতকদের ফাঁসির মধ্য দিয়ে।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য সাঁজোয়া যানসহ হামলা চালায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের শেখ মুজিবর রহমানের বাসভবনে। ঘাতকের নির্মম বুলেট কেবল জাতির পিতাকেই রক্তাক্ত করেনি বরং একে একে হত্যা করা হয় পরিবারের সব সদস্যকে। এমনকি বাদ যায়নি শিশুপুত্র রাসেলও। সেই নারকীয় হামলার পর দেখা গেছে, ভবনটির প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাঁচ, মেঝে ও ছাদে রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র। প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ। তাঁর তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। পাশেই পড়ে ছিল তাঁর ভাঙা চশমা ও অতি প্রিয় তামাকের পাইপটি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান তাঁরা। রচিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকিত দিন।

৯৬-এ আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিলের আগ পর্যন্ত ২১ বছর স্বঘোষিত খুনিরা বিচারের আওতা থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই প্রথম এর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৮-এ দায়রা জজ আদালতের দেয়া ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে পুনর্মূল্যায়িত হয় এবং ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অনাগ্রহ ও নিষ্ক্রিয়তায় আপিল বিভাগে আরো একজন বিচারকের অভাবে দীর্ঘ ৫ বছর ঝুলে থাকে মামলাটির আপিল শুনানি। পরবর্তীতে ২০০৭-এর ৮ আগস্ট এই মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হয়। এরপর বর্তমান সরকারের সময়ে আপিল বিভাগে চারজন বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার পর মামলাটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয় এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পন্ন হয়।

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার লক্ষ্য ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম মুখর। সংগ্রামের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছিলেন। আর তাঁরই সুযোগ্য তনয়া, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যখন তরুণরা আঁকড়ে ধরবে সেদিনই বাস্তবায়িত হবে সোনার বাংলাদেশ।

সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের মন্তব্যে- “বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি এদেশের মানুষকে ভালবাসতেন; আর সবচেয়ে বড় দোষ হলো তিনি সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন এদেশের মানুষকে। যে কারণে তিনি বড় হয়ে এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম খেটেছেন। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। সাধারণ মানুষের কষ্ট, দুঃখ-দুর্দশা, অভাব অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছেন। সেই থেকেই তাঁর মধ্যে অনুভূতি কাজ করেছে যে, এদেশের মানুষের জন্য কিছু করতে হবে। কষ্ট, দুঃখ-দুর্দশা, অভাব থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই দরিদ্র মানুষগুলোর জন্যই তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। এ মানুষগুলোর কথা তুলে ধরতে গিয়েই তিনি তদানীন্তন সরকারগুলোর রোষানলে পড়েন। বার বার গ্রেফতার হন।”

জাতির পিতা এবং তাঁর পরিবারের শোকের বিস্মরণ সম্ভব নয়। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, চির ভাস্মর থাকবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের নাম। জাতির পিতার শোককে আমাদের শক্তিতে পরিণত করতে হবে, একযোগে কাজ করতে হবে দেশ গঠনে। আমাদের সোনার বাংলাই শান্তি দিবে আমাদের নেতা, আমাদের পিতা বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মাকে। পরপারে শান্তিতে থাকুক আমাদের মহান আদর্শ, আমাদের পিতা।

 

কেঁদেছিল আকাশ, ফুঁপিয়ে ছিল বাতাস;

বৃষ্টিতে নয়, ঝড়ে নয়-

এ অনুভূতি ছিল শোকের ।।

 

 

–।

শেয়ার করুন:
  • 70
    Shares

You May Also Like