হয়তোবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না…

রামিম হাসান, ঝিনাইদহ থেকেঃ গ্রাম বাংলার মাত্র ২৪-২৫ বছরের টকবগে তরুন যুবক ইসমাইল হোসেন পলান গ্রামের আর ১০টা যুবকের মতোই বেড়ে উঠছিল। তখন ১৯৭১ সাল, শুরু হয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধ । কিন্তু এই যুবক অন্যদের মতো ঘরে বসে থাকতে পারেনি, দেশ-মাতৃকার স্বাধীনতার জন্যে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধের মাঠে। ঝিনাইদহের শৈলকুপার দহকোলা গ্রামের ইব্রাহীম মিঞার ছেলে ইসমাইল হোসেন যোগদেন মুক্তি বাহিনীতে। এলাকায় বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেয়ার পর শৈলকুপার আবাইপুরে ঐতিহাসিক আবাইপুর যুদ্ধে পাক-হানাদারদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন । ১৯৭১ সালে ১৪ অক্টোবর আবাইপুর গ্রামে পাক বাহিনীর সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন ইসমাইল হোসেন সহ ৪১জন বীরযোদ্ধা,এদের মধ্যে কয়েকজন গ্রামবাসীও ছিল । সেখানে তাদের গনকবর দেয়া হয়। একটি স্মৃতি ফলকে শহীদ ইসমাইল হোসেন সহ ৪১ যোদ্ধার নাম লেখা হয়, যা আজো রয়েছে। এই দিনটি আবাইপুর ট্রাজেডী দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
অথচ দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পরে এসে শহীদ ইসমাইল হোসেন কে আর খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই । সেই গণকবরের স্মৃতি ফলক সহ শৈলকুপা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সামনে সাম্প্রতি নির্মিত স্মৃতি ফলকে তার পিতার নাম সঠিকভাবে লেখা হয়নি। এমন কি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের গেজেট সহ স্থানীয় নানা কাগজপত্রেও এই শহীদের বাবার নামটি নানা ভ্রান্তিতে লেখা হয়েছে। আর তার পরিবার-স্বজনের জন্যেও জোটেনি কোন রাষ্ট্রীয় সম্মান, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। ১৯৭১ সালের সম্মুখ সমরের এই নায়ক, সম্মুখ সমরের এই অকুতোভয় সৈনিক যেন হারিয়ে গেছে নানা বিস্মৃতির আড়ালে। স্বাধীনতার এই বীরসেনানীদের স্মরণে লেখা গানটি যেন বড় নির্মম সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে শহীদ বীরযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের জীবনে ‘‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা…হয়তবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না/বড় বড় লোকেদের ভীড়ে জ্ঞানী আর গুনিদের আসরে/তোমাদের কথা কেউ কবে না’’।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়,ঝিনাইদহের শৈলকুপার দহকোলা গ্রামের মৃত ইব্রাহীম মিঞার ৫ মেয়ে ও ৩ ছেলের মধ্যে শহীদ ইসমাইল হোসেন পলান ভাইদের মধ্যে ছিল ছোট। তার অপর দুই ভায়ের নাম হাসেন মিঞা ও হারুন অর রশিদ । ইসমাইল হোসেনের অপর এই ভাই দুটি ও মাও মারা গেছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে ৩/৪ বার গোপনে বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন শহীদ ইসমাইল হোসেন। ইসমাইল হোসেনের বড় ভাই মৃত হাসেন মিঞার ছেলে আবুবকর সিদ্দিক জানান তার চাচা ইসমাইল মিঞা পলান আবাইপুরযুদ্ধে শহীদ হন। বাড়িতে খবর এলে বড় ভাই হাসেন মিঞা আবাইপুরে যান তার ভাই ইসমাইলকে সনাক্ত করতে। তিনি তার ভাইকে সনাক্ত করে আবাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের গণ কবরে চিরনিদ্রায় শায়ীত করে আসেন।
ছেলের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর ইসমাইল মিঞার মা ফুল নেছা পুত্র শোকে পাগল হয়ে স্বাধীনতার ৩/৪ বছর পর মারা যান। তিনি অভিযোগ করেন সম্মুখযুদ্ধে শহীদ ইসমাইল হোসেনের পিতার নাম স্মৃতিফলকে সঠিক ভাবে লেখা হয়নি। পিতার নাম ইব্রাহীম মিঞা হলেও সেখানে লেখা হয় মৃত ছানারউদ্দিন। আবার শহীদ এ মুক্তিযোদ্ধার বাংলাদেশ গেজেট ১৯১০ এ পিতার নাম খয়বর মিয়া লেখা হয়েছে। বড় ভাই হাসেন মিঞা অনেক চেষ্টার পরও গেজেট ও নামফলকে তার পিতার নামটি সংশোধন করাতে ব্যর্থ হন। আশ্বাসে অনেক টাকাও খরচ করেছেন তারা। শত চেষ্টার পর বড় ভাই হাসেন মিঞা ২০০৪ সালের ১০ই র্ফেরুয়ারী মারা যান। এরপর ভায়ের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও সুযোগ সুবিধা পেতে চেষ্টা শুরু করেন অপর ভাই জেল পুলিশ হারুন অর রশিদ। অর্থকড়ি খরচ করে ব্যর্থ হয়ে তিনিও মারা যান ২০১২ সালের জুন মাসে।
এমন সব ঘটনার পর ভাতীজারা চাচার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করে চলেছেন। তারা নিজ খরচে বাড়ির সামনে একটি স্মৃতিফলক গড়েছেন। তবে পরিবারের অপর জীবিত সদস্যদের অভিযোগ গেজেটে এবং নামফলকে শহীদ এ মুক্তিযোদ্ধার পিতার নাম পরিবর্তন করে হয়তো বা মুক্তিযোদ্ধা কল্যান তহবিল থেকে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন কেউ।সরেজমিনে দহকোলাগ্রামে গেলে ইসমাইল মিঞার পিতা খয়বর মিয়া বা ছানারউদ্দিন এ নামে কাউকে খুজে পাওয়া যায়নি। তাদের প্রতিবেশী মুক্তিযোদ্ধা নুর ইসলাম জানান, ইসমাইল
হোসেন মিঞা পলানের পিতার নাম মৃত ইব্রাহীম মিঞা। তিনি খয়বর মিয়া বা ছানারউদ্দিনের সন্তান না, এ নামে গ্রামে কেউ নেইও।
শৈলকুপা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার রহমত আলী মন্টু বলেন, ইসমাইল হোসেন আবাইপুরে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। তার নাম আবাইপুর ও শৈলকুপার স্মৃতিফলকে লেখা আছে।এ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পিতার নাম নিয়ে কোন অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে সঠিকভাবে লিখা উচিৎ। এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সহ পরিবারটির প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান, সুযোগ-সুবিধা দেয়া উচিত ।
শেয়ার করুন:
  • 15
    Shares

You May Also Like