বিএনপি জামায়াতের আমলনামা-পূর্ণিমা রানীর কথা মনে কি পড়ে বাংলাদেশ!

১৩ থেকে ১৪ বছরের দুরন্ত এক কিশোরী পূর্ণিমা রানী শীল। হ্যাঁ, সেই ছোট্ট কিশোরী পূর্ণিমার কথা বলছি, সংখ্যালঘু বা হিন্দু হবার ‘অপরাধে’ যাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে দলবেঁধে ধর্ষণ করেছিল বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা।

২০০১ সালের ঘটনা, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে সবেমাত্র। কারচুপি ও ষড়যন্ত্রের ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। গদিতে বসতে দেরী, অত্যাচারের স্টীম রোলার চালাতে দেরী হয়নি দলীয় ক্যাডারদের। আর সেই নৃশংস অত্যাচারের শিকার সবচেয়ে বেশী হয়েছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। ধরে নেয়া হয় যে, হিন্দু বা সংখ্যালঘু ভোটারেরা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক, একারণেই তাদের ওপর ক্ষোভটা বেশী ঝেড়েছিল বিএনপি জামায়াত নামক সাপ্রদায়িক শক্তিটি।

তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস আর হৃদয়বিদারক গল্পটা পূর্ণিমা রানী শীলের। ২০০১ সালে পূর্ণিমার বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর, ক্লাস এইটের ছাত্রী ছিল এই মেয়েটা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ওদের বাড়ি, সেখানেই একটা স্কুলে পড়তো সে। ২০০১ সালের ৮ই অক্টোবর রাতটা হয়তো সারাজীবনের জন্যে দুঃস্বপ্নের এক কালরাত্রি হয়ে আছে। সেই রাতে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত ক্যাডারেরা হামলা করেছিল তাদের বাড়িতে। পূর্ণিমা আর তার মা’কে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়ি থেকে, একটু দূরের একটা ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে প্রায় পনেরো থেকে বিশজন ধর্ষককামী যুবক ধর্ষণ করেছিল কিশোরী পূর্ণিমাকে। মায়ের সামনেই মেয়ের ছোট্ট শরীরটার ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল এই নরপিশাচের দল। পূর্ণিমার মায়ের ক্ষমতা ছিল না এই পশুগুলোকে বাধা দেয়ার, তিনি শুধু মিনতি করে বলেছিলেন- “বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে এসো, নইলে ও মরে যাবে।”

সেই রাতের বিভীষিকার কথা এখনও স্পষ্ট মনে করতে পারেন পূর্ণিমা। বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, “ওরা আমাকে এমন অবস্থায় যে হাতের ওপর করে তুলে নিয়ে কেউ খামচাচ্ছে, কেউ জামা-প্যান্ট টেনে খুলে ফেলছে। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে শ্মশানঘাট। সেই শ্মশানঘাটের মাঝে আমাকে একটা পতিত ক্ষেতের মধ্যে রেখে গণধর্ষণ করা হয়। আবার ওদের হাতের টর্চলাইটের আলোতে আমি ওদের দেখতে পাচ্ছি।”

বিএনপি জামায়াত সরকারের আমলে এ ঘটনার বিচার তো দূরের কথা, প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে পূর্ণিমার গোটা পরিবারকেই।  তবে পূর্ণিমা বিচার পেয়েছিল, সেই বিচারের জন্যে তাঁকে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল দীর্ঘ দশ বছরেরও বেশী সময়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে, ২০১১ সালে আদালত সতেরো আসামীর মধ্যে এগারো জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

২০০১ পরবর্তী সময়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও কেন্দ্রীয়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয় পূর্ণিমার প্রতি।

পূর্ণিমা তার অতীত ও বর্তমান কাহিনীর বিবরণ দিতে গিয়ে সেইসব ঘটনা স্মরণ করেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন পূর্ণিমা। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর পরিবারের চরম দুর্দিন ও অসহায় অবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লাপাড়ার আদর্শগ্রামে তাদের বসবাসের জন্য পাঁচ শতক জমি দিয়েছেন। ঘর তুলে দিয়েছেন। তাকে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি দিয়েছেন। তার ভাই গোপাল চন্দ্র শীলকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। লেখাপড়া করার সুযোগ করে দিয়েছেন পূর্ণিমার। তিনি প্রধানমন্ত্রীর এ অবদানের কথা কোনোদিন ভুলবেন না।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাংসদ তারানা হালিম পূর্ণিমাকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। এতকিছুর পরেও ২০০১ সালের সেই লজ্জার ইতিহাস ভুলতে পারবে কি বাংলাদেশ? প্রশ্ন জাগে, বিএনপি-জামায়াত আবারও ক্ষমতায় এলে তাদের নতুন শিকার কে হবে??

 

 

শেয়ার করুন:
  • 9.6K
    Shares

You May Also Like