জামায়াতের নতুন সিদ্ধান্তে বিব্রত ঐক্যফ্রন্ট

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা জামায়াতে ইসলামীর নতুন একটি সিদ্ধান্তে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। কারণ, ঐক্যফ্রন্টের মতো জামায়াতও একই প্রতীকে ভোট করতে যাচ্ছে। আর এখন ঐক্যফ্রন্টের শরিকরা এই প্রতীকে ভোট চাইলে সেটি জামায়াতের পক্ষেও যাচ্ছে।

বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সময় থেকেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াত। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি থাকলে জোট নয়- এমন ঘোষণা দিয়ে পরে জোট করেছেন ড. কামাল হোসেন। যুক্তি ছিল, এই জোট জামায়াতের সঙ্গে নয়। কিন্তু এবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে তারা।

ফ্রন্টের শরিক একটি দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা জানিয়েছেন, জামায়াতকে যেন ধানের শীষ প্রতীক দেয়া না হয়, সে জন্য বিএনপিকে তারা অনুরোধ করেছিলেন। তবে বিএনপি সেটা রাখেনি।

ওই নেতা বলেন, ‘সারা জীবন রাজনীতি করে এসেছি জামায়াতের বিরুদ্ধে। এখন জোটের কারণে তারা এবং আমরা একই প্রতীকে ভোট করব। তাহলে আমাদের আর মুখ থাকে কী করে?’।

নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামীর এবার দলীয় প্রতীকে ভোট করার সুযোগ নেই। তবে জোটের কোনো একটি শরিক দলের প্রতীকে ভোট করার সুযোগ সব সময় ছিল। এতদিন অন্য দলের প্রতীকে ভোট করতে রাজি না থাকলেও চলতি সপ্তাহে সিদ্ধান্ত হয়, তারা ব্যবহার করবে ধানের শীষই।

জামায়াত এবং বিএনপির নেতারা মনে করেন, যদি ধানের শীষের বদলে একেকটি এলাকায় জামায়াত নেতারা একেকটি প্রতীকে ভোট করেন, তাহলে দলের একনিষ্ঠ বহু সমর্থকের ভোট মার্কার কারণে পাওয়া যাবে না। এ কারণেই তারা শেষ পর্যন্ত একটি মার্কা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

এরই মধ্যে ধানের শীষ ব্যবহারের প্রত্যয়ন নিয়ে ২৫টি আসনে প্রার্থিতা জমা দিয়েছেন জামায়াতের নেতারা। আরও প্রায় তিন ডজন নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।

ঐক্যফ্রন্টের ওই শরিক দলের নেতা বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধানের শীষে ভোট চাইব। এখন জামায়াতও যেহেতু এই প্রতীকে ভোট করবে, তাই আমাদের এই আবেদন তাদের পক্ষেও যাবে। আর এটিকে নিশ্চয় আওয়ামী লীগ ব্যবহার করবে আমাদের বিরুদ্ধে।’

ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামও শুরুতে তাদের প্রতীক উদীয়মান সূর্য ব্যবহারের কথা জানিয়েছিল। পরে তারাও ধানের শীষ ব্যবহারের কথা জানায়। আর নির্বাচন কমিশনে সে চিঠিও দেয়া হয়।

ঐক্যফ্রন্টে বিএনপির শরিক দলগুলো হলো কামাল হোসেনের গণফোরাম, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা দল ও আ স ম আব্দুর রবের জেএসডি।

এসব দলের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নেতা বরাবর জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বলে এসেছেন। কামাল হোসেন যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়ে নানা সময় কথা বলে জামায়াতের বিরাগভাজনও হয়েছেন। কাদের সিদ্দিকী এবং রব দুইজনই মুক্তিযোদ্ধা। তারা কখনো জামায়াতের পক্ষে কথা বলেছেন, এমন নয়।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না দাবি করেন, তিনি জামায়াতের ধানের শীষে ভোট করার করার সিদ্ধান্ত জানেন না। বলেন, ‘আমি এখন এলাকায় আছি, এ বিষয়টি আমি জানি না তো। আপনার কাছে শুনলাম, আরও ভালো করে শুনি, তারপর কমেন্টস করব।’

দলের বাইরে ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয়া মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা জামায়াতের পক্ষে ভোট চাইব কেন? আমরা চাইব, ধানের শীষের পক্ষে।’
কিন্তু জামায়াত তো এই প্রতীকেই ভোট করবে। তাহলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে আপনার এই আহ্বান তো স্বাধীনতাবিরোধী দলটির পক্ষেও যাবে- এমন প্রশ্নে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের যত শক্তি আছে, যারা পরিবর্তন চায়, তারা ধানের শীষের পক্ষে ভোট করবে। জামায়াত মত পরিবর্তন করেছে।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতার দাবি, জামায়াত কোনো দল হিসেবে ভোটে আসছে না। দলটির কিছু ব্যক্তি নির্বাচন করছেন যারা আগে জামায়াত করতেন। বলেন, ‘মত পরিবর্তন করে যে কেউ বিএনপির সঙ্গে আসতে পারবেন। তাতে কোনো অসুবিধা নেই।’

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন বলেন, ‘জামায়াতের নিবন্ধন নাই, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো জোটও নাই। ধানের শীষ হলো বিএনপির মার্কা। এখনো বিএনপি যদি তাদের মার্কা কারও কাছে ভাড়া দেয় সেটা তাদের বিষয়, আমাদের বলার কিছু নাই।’

‘আমরা কোনোভাবে জামায়াতের সঙ্গে একাকার হইনি। আমাদের জোট বিএনপির সঙ্গে, জামায়াতের সঙ্গে নয়। বরং আওয়ামী লীগই বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশ্রয় দেয়। এই যে শফীরা (কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের প্রধান আহমদ শাহ শফী) কি সাম্প্রদায়িক শক্তি নয়? আমরা এই জায়গা থেকে সরে আসার চেষ্টা করছি।’

জোটের একটি শরিক দলের এক শীর্ষস্থানীয় নেতার মতের বিষয়টি জানালে ড. কামাল হোসেনের ঘনিষ্ঠ এই নেতা পাল্টা প্রশ্ন রাখেন, ‘জামায়াত যখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকে, তখন এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। বিএনপির সঙ্গে থাকলেই যত প্রশ্ন। তারা সব কিছু করবে আর আমরা করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়?’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, ‘বিএনপিকে বিষয়টি আগেই স্পষ্ট করা উচিত ছিল, তারা করেনি। এখন এটা ঐক্যফ্রন্টের নেতারা কীভাবে নেয়, সেটাই বিষয়।’

শেয়ার করুন:
  • 873
    Shares

You May Also Like